দক্ষিণ লেবানন যখন অব্যাহত বিমান হামলা ও ব্যাপক বোমাবর্ষণের মুখে, তখন প্রতিরোধ বিশ্লেষকরা ‘মজলুম অথচ শক্তিশালী শিয়া’ ধারণার আলোকে হিজবুল্লাহর অদম্য স্থিতিশীলতা এবং নেতৃত্বের শাহাদাতের পরও সংগঠনটির অটুট থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন।
চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অনেকের মনেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—দক্ষিণ লেবাননে এত চাপ, অবরোধ, নিরবচ্ছিন্ন বোমাবর্ষণ এবং শীর্ষ নেতা-কমান্ডারদের শাহাদাতের পরও কি হিজবুল্লাহ টিকে থাকতে পারবে?
এর উত্তর মূলত পার্থিব নয়, বরং ঐশী।
আহলুল বাইত (আ.)-এর প্রকৃত অনুসারীরা তাঁদেরই মতো একই সঙ্গে শক্তিশালী ও মজলুম। তাঁরা শক্তিশালী, কারণ তাঁদের বিশ্বাসের উৎস ঐশী। আর যা আল্লাহপ্রদত্ত, তা মর্যাদা, শক্তি ও বিজয়ের উৎস। আবার তাঁরা মজলুম, কারণ দুনিয়াপূজারি ও প্রবৃত্তির অনুসারীরা তাঁদের নির্মূল করতে সব ধরনের উপায় ও শক্তি প্রয়োগ করে। কিন্তু তাঁরা জীবন, সম্পদ ও সম্মান বিসর্জন দিয়েও নিজেদের ঈমান, আদর্শ ও বিশ্বাসে অবিচল থাকেন।
লেবাননের হিজবুল্লাহ এই ‘মজলুম অথচ শক্তিশালী শিয়া’-র এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তারা পবিত্র কুরআনের এই ঘোষণাকে—"জেনে রেখো, আল্লাহর দলই বিজয়ী।" (أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ)—নিজেদের সংগ্রামের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে দিন দিন তাদের মর্যাদা, শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ হিজবুল্লাহ এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যা বিশ্বের বহু বিশ্লেষক, চিন্তাবিদ ও স্বাধীনতাকামী মানুষের কাছে বিস্ময় ও শ্রদ্ধার বিষয়। একই সঙ্গে এটি দখলদার ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থা এবং অঞ্চলের প্রতিক্রিয়াশীল আরব শাসকদের জন্য চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে।
অনেকেই মনে করেছিলেন, হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাতের পর সংগঠনটি হয়তো তার শক্তি ও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু পরবর্তী সংঘাতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর কার্যকর ও ধারাবাহিক প্রতিরোধ আবারও প্রমাণ করেছে যে, এই সংগঠনের শক্তি কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়।
এ প্রসঙ্গে শহীদ ইমাম ও ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহিল উযমা সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী (রহ.)-এর বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর শাহাদাতের পর তিনি বলেন— “তিনি লেবাননে যে ভিত্তি স্থাপন করেছেন এবং প্রতিরোধের অন্যান্য কেন্দ্রকে যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে তা শুধু বিলীনই হবে না; বরং তাঁর এবং এই ঘটনার অন্যান্য শহীদদের রক্তের বরকতে তা আরও সুদৃঢ় হবে। মহান আল্লাহর সাহায্যে প্রতিরোধ ফ্রন্টের আঘাত ভঙ্গুর ও পতনোন্মুখ ইসরায়েলি শাসনব্যবস্থার ওপর আরও কঠোর হবে।”
হিজবুল্লাহর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তার মজলুমিয়াত। স্বাধীনতা ও প্রতিরোধের আদর্শে অবিচল থাকার কারণে একদিকে প্রতিক্রিয়াশীল আরব সরকার, অন্যদিকে দখলদার ইসরায়েল এবং লেবাননের অভ্যন্তরে তাদের মদদপুষ্ট গোষ্ঠীগুলো—সবাই বিভিন্ন উপায়ে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছে। সামরিক আগ্রাসন, গণমাধ্যমে অপপ্রচার, সাম্প্রদায়িক বিভাজন সৃষ্টি, অর্থনৈতিক অবরোধ—সব ধরনের চাপই তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের শিয়া অধ্যুষিত এলাকায় আবাসিক ভবনে বোমাবর্ষণ, নারী ও শিশু হত্যা এবং ধারাবাহিক অপপ্রচার—এসবই হিজবুল্লাহর ওপর চলমান মজলুমিয়াতের নির্মম চিত্র।
কিন্তু পবিত্র কুরআনের শিক্ষা, আহলুল বাইত (আ.)-এর জীবনাদর্শ, প্রতিরোধের ইতিহাস এবং আল্লাহর অঙ্গীকার প্রমাণ করে যে, এসব চাপ কোনো আদর্শভিত্তিক আন্দোলনকে ধ্বংস করতে পারে না। বরং আল্লাহর চিরন্তন বিধান হলো—শত্রুরা যতই তাঁর নূর নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুক, তিনি তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— “তারা চায় নিজেদের মুখের ফুঁ দিয়ে আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে; কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতা দান করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আস-সাফ, আয়াত ৮)
হিজবুল্লাহর ওপর চলমান এই নির্যাতন তথাকথিত মানবাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিদারদের ভণ্ডামিও উন্মোচিত করেছে। কারণ, তারা নিজেদের চোখের সামনে সংঘটিত নৃশংস অপরাধ প্রত্যক্ষ করেও নীরব থেকেছে।
অন্যদিকে, এই মজলুমিয়াত ও প্রতিরোধ বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ অক্ষ এবং স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে। আজ হিজবুল্লাহ শুধু সহায়তা প্রত্যাশী কোনো সংগঠন নয়; বরং সীমিত ভূখণ্ড ও সীমিত সম্পদ নিয়েও অটল ঈমান, দৃঢ় সংকল্প এবং অবিচল প্রতিরোধের মাধ্যমে কীভাবে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী আগ্রাসী শক্তির মোকাবিলা করা যায়, তার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে হিজবুল্লাহ আল্লাহর নূরের এক উজ্জ্বল প্রকাশ। আর আল্লাহর নূর কখনো নিভে যাওয়ার নয়।
আপনার কমেন্ট